আসসালামু আলাইকুম। নবাগতদের জন্য ভালো অপশন হিসেবে যে লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমটি সবচেয়ে বেশি সাজেস্ট করা হয়, সেটা সম্ভবত লিনাক্স মিন্ট। উইন্ডোজের সিমিলার ও সহজ ইন্টারফেস এবং মাল্টিমিডিয়া কোডেক ও ড্রাইভার সাপোর্ট ইম্প্রুভমেন্ট দ্রুতই লিনাক্স মিন্টকে বিগিনারদের লিনাক্স হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিলো। যদিও এখনকার সময়ে এই দিকগুলো এককভাবে লিনাক্স মিন্টের বিশেষত্ব আর বলা যায় না, তবে সেই খ্যাতি থেকে গেছে।
লিনাক্স মিন্ট উবুন্টুর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অবশ্য একটি বিশেষ সংস্করণ আছে, লিনাক্স মিন্ট ডেবিয়ান এডিশন (LMDE), যেটা ডেবিয়ানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

যাইহোক, লিনাক্স মিন্ট তিনটি ডেস্কটপ এনভায়নমেন্টে পাওয়া যায়- সিনামন, এক্সএফসিই ও মাতে। এর মধ্যে সিনামন লিনাক্স মিন্টের ডেভেলোপারদের নিজেদের ডেভেলোপ করা। লিনাক্স মিন্টের সবচেয়ে ভালো এক্সপ্রেরিয়েন্সের জন্য সিনামন এডিশনটি সাধারণত সাজেস্ট করা হয়।
তবে গত বছর আমি লিনাক্স মিন্ট ২২ রিলিজের সময় সিনামন সংস্করণের রিভিউ লিখেছিলাম। সেটা এখানে পাবেন: লিনাক্স মিন্ট ২২ রিভিউ
আজকের লেখাটি থাকছে লিনাক্স মিন্টের XFCE সংস্করণ নিয়ে। XFCE সবচেয়ে লাইটওয়েট ডেস্কটপগুলোর একটা। 2 GB বা কম র্যাম হলে আরো ভারি ডেস্কটপগুলোর তুলনায় XFCE তে লক্ষ্যণীয়ভাবে ভালো পারফর্মেন্স পাওয়া সম্ভব।
প্রসঙ্গত, লিনাক্স মিন্টের সর্বশেষ সংস্করণ 22.2, তবে আমি এই রিভিউটি 22.1 ভার্সন ব্যবহার করে করছি। আগে থেকে ডাউনলোড করা ছিলো আরকি, আর লিমিটেড ইন্টারনেটে আছি এই মুহুর্তে…
লিনাক্স মিন্ট
লিনাক্স মিন্টের কয়েকটি দিক তো এর মধ্যেই বলা হলো। এক্সপ্রেরিয়েন্সকে সহজ ও ইউজার ফ্রেন্ডলি করার জন্য বিভিন্ন কাজ তারা করেছে। আবার সময়ের সাথে অনেক আধুনিকায়ন তো তারা অবশ্যই করেছে- তবে মজার ব্যাপার হলো লিনাক্স মিন্ট ব্যবহারের সময় প্রতিবার প্রায় এক দশক আগে প্রথমদিকে লিনাক্স ব্যবহারের যে সময়টা, সে সময়টার একটা আবহ খুঁজে পাই। ট্রেডিশনাল লেআউট, প্যাকেজিংকে প্রাধান্য দেয়াসহ সার্বিকভাবে লিনাক্স মিন্টের ওয়ার্কফ্লো সে ব্যাপারটা ধরে রেখেছে।
লিনাক্স মিন্ট ইন্সটলের পর Welcome ডায়ালগে বিভিন্ন ফিচার ও হেল্পফুল রিসোর্স দেয়া আছে। যেটা একজন ইউজারকে সহজ একটি শুরু করতে সাহায্য করবে।

অ্যাপ্লিকেশনসের কথা বললে বেসিক সিস্টেম ইউটিলিটিগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অ্যাপসসহ মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ সেটআপ নিয়ে আসে। যেমন- বেসিক আঁকাআঁকির জন্য Drawing, ফায়ারফক্স ওয়েব ব্রাউজার, ট্রান্সমিশন টরেন্ট ক্লায়েন্ট, লিব্রাঅফিস স্যুট প্রভৃতি। লিনাক্স মিন্ট ডেভেলোপারদের নিজেদের তৈরি বিভিন্ন অ্যাপস আছে- যেমন, Software Manager, Web Apps, ফাইল শেয়ারিংয়ের জন্য Warpinator, রিসেন্ট ডকুমেন্ট এক্সেসের জন্য Library, টিভি দেখার জন্য Hypnotix প্রভৃতি।
ওয়েব অ্যাপস লিনাক্স মিন্টের একটি ইউজফুল টুল। এটা দিয়ে যেকোন ওয়েবসাইটকে অ্যাপের মত করে সিস্টেমে রাখতে পারবেন।

সফটওয়্যার ইন্সটলের জন্য লিনাক্স মিন্টের সফটওয়্যার ম্যানেজার (mintinstall) এর ইন্টারফেস বেশ সিম্পল। এমনিতে এধরণের সিম্পল লেআউট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইফেক্টিভ, তবে এখানে কিছু দরকারি ব্যাপারও মিসিং আছে। যেমন- ইন্সটল্ড অ্যাপ্লিকেশনস বা প্যাকেজগুলোর কোন লিস্ট দেখা যায় না, যেটা থাকা উচিৎ ছিলো। সফটওয়্যার আপডেট ও ভার্সন আপগ্রেড ম্যানেজমেন্টের জন্য আলাদা একটি অ্যাপ আছে, Update Manager।

বিভিন্ন লিনাক্স ডিস্ট্রো বর্তমানে ইউনিভার্সাল প্যাকেজিং ফর্মেট যেমন Flatpak বা Snap কে প্রাধান্য দিলেও লিনাক্স মিন্ট এখনো ডেবিয়ান পরিবারের ডিস্ট্রোগুলোর ট্রেডিশনাল dpkg প্যাকেজিংকে প্রাধান্য দেয়। প্রিইন্সটল্ড সবগুলো প্যাকেজ dpkg ফরমেটে আছে। তবে সেইসাথে আউট অফ দা বক্স Flatpak সাপোর্ট আছে, Flathub-এর অ্যাপগুলো খুব সহজে প্যাকেজ ম্যানেজার থেকে ইন্সটল করা যায়।

লিনাক্স মিন্টের ডিফল্ট ওয়ালপেপার (একদম প্রথম ছবিতে যেটা ছিলো) আমার ততটা পছন্দ না হলেও মিন্টের ওয়ালপেপারের কালেকশন আমার কাছে খুব চমৎকার মনে হয়। এলিগেন্ট বেশ কিছু ওয়ালপেপার আছে এখানে।

থিমিংয়ের ক্ষেত্রে Mint X, Mint L ও Mint Y সিরিজের থিমগুলো ডার্ক ও লাইট এবং বিভিন্ন একসেন্ট কালার ভ্যারিয়েন্টে পেয়ে যাবেন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী স্টাইল, আইকন থিম, উইন্ডো ডেকোরেশন প্রভৃতি কাস্টমাইজ করে নিতে পারবেন। এর বাইরেও যেকোন GTK থিম ও আইকন থিম ব্যবহার করা যায়।
XFCE ডেস্কটপ
এতক্ষণ পর্যন্ত যে বিষয়গুলো আলোচনা হলো, তা লিনাক্স মিন্টের সিনামন, XFCE বা মাতে সবগুলো ভার্সনের জন্যই প্রযোজ্য, হয়ত উপস্থাপনে একটু ভিন্নতা থাকতে পারে। অন্যদিকে ডেস্কটপ এনভায়রনমেন্ট ডেস্কটপের প্যানেল, অ্যাপলেটস, থিমিং সিস্টেম, ফাইল ম্যানেজার, সেটিংস প্রভৃতি প্যাকেজগুলোর সমষ্টি।
তো আমরা এখন XFCE এডিশনের বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কথা বলি। আগেই বলা হয়েছে, XFCE খুব লাইটওয়েট একটা ডেস্কটপ। আমি এই রিভিউ লেখার সময় ভার্চুয়াল মেশিনে মাত্র 1 GB র্যাম অ্যালোকেট করে XFCE ব্যবহার করছিলাম, এবং বেসিক ইউসেজের জন্য 1 GB র্যামেও XFCE খুবই রেসপোন্সিভ আচরণ করে।

XFCE ডেস্কটপের উইন্ডো ম্যানেজারে মিনিমাইজ, ম্যাক্সিমাইজ, ক্লোজ প্রভৃতিতে কোন এনিমেশন নেই। যেটা প্রথমে একটু অকওয়ার্ড লাগে, তবে এটার ভালো দিক আছে- ডিসট্রাকশন কম, সবকিছু ইনস্ট্যান্ট মনে হয়। আর হ্যা, অবশ্যই এটা XFCE-কে রিসোর্স এফিশিয়েন্ট হতেও সাহায্য করেছে।
অন্যান্য দিকেও XFCE-তে এরকম সিমপ্লিসিটি পাবেন। ফিচার ও ফাংশনালিটির অনেক আধিক্য নেই। অবশ্য এখানে কথা আছে, যেটা কাস্টমাইজেবিলিটি অংশে আলোচনা হবে।
তবে একইসাথে লিনাক্স মিন্ট XFCE যদিও অ্যাপিয়ারেন্স ও বিভিন্ন ফিচার নিয়ে বর্তমান সময়ের সাথে মানানসই একটা এক্সপ্রেরিয়েন্স দেয়, তবে অনেক জায়গায় সময়ের একটা ছাপ এখানে আছে। আসলে XFCE ডেস্কটপের ডেভেলোপমেন্ট বিগত বছরগুলোতে বেশ মন্থর গতিতেই হয়ে আসছে।
যেমন, নিচের ছবিতে ফাইল ম্যানেজার বা সেটিংসে যতক্ষণ পর্যন্ত একটা বাড়তি কলামের জায়গা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফাইলগুলোর ডানদিকে বাড়তি ফাঁকা স্পেস থেকে যায়, কলামগুলোর মধ্যে স্পেসিং ডিস্ট্রিবিউট হয়ে যায় না। প্যানেলের আইকন সাইজ সব অ্যাপলেট প্যানেল প্রিফারেন্স থেকে ফলো করে না, কিছু অ্যাপলেট আলাদাভাবে সেট করতে হয়। একইভাবে বিভিন্ন মেনুর স্টাইল ঠিক বর্তমান সময়ের সাথে মানানসই না।

তবে XFCE চালানোর আরেকটা কারণ হবে XFCE ডেস্কটপ যে পরিমাণ এক্সটেনসিবিলিটি আপনাকে দিবে। বিশেষ করে যদি আপনি লিনাক্সের পুরনো ইউজার হয়ে থাকেন, তাহলে এখানে আপনি হয়ত একইসাথে একটা নস্টালজিয়া আর লিনাক্স এক্সপ্রেরিয়েন্সের পিওরিটি খুঁজে পাবেন।
কাস্টমাইজেবিলিটি: Where Things Get Crazy…
লিনাক্স নিয়ে লেখার কঠিন দিকটা হলো এটা প্রচন্ডরকম মডুলার। শুধু বেসিক কাস্টমাইজেশনে সীমিত না, বলা যায় প্রত্যেকটা পার্ট মিক্স এন্ড ম্যাচ করা যায়। কেডিই প্লাজমা বা গ্নোম এবং অনেকাংশে সিনামন প্রভৃতি ডেস্কটপগুলো অবশ্য এখন অনেকাংশে ইন্টিগ্রেটেড একটা সেটআপ। কিন্তু XFCE বা Mate-র মত ডেস্কটপগুলো এক্ষেত্রে অন্য একটা পর্যায়ে।
Linux Mint XFCE বেসিক পর্যায়ে ঘাটাঘাটি করলে প্যানেল অ্যাপলেটস, থিম, আইকনস, ফন্টস এরকম বিভিন্ন সেটিংস ও অপশনস পেয়ে যাবেন। সত্যি বলতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাস্টমাইজেশন অপশন অন্য কিছু ডিস্ট্রোর চেয়ে কম-ই দেখবেন।
কিন্তু বিষয়টা হলো এখানে বলতে গেলে প্রত্যেকটা পার্ট আলাদা আলাদা প্যাকেজ, একটা আরেকটার ওপর নির্ভরশীল না। মানে আপনি ফাইল ম্যানেজারের মত সিস্টেম ইউটিলিস থেকে শুরু করে প্যানেল, অ্যাপ মেনু, ফাইল ম্যানেজার, এমনকি উইন্ডো ম্যানেজার পর্যন্ত বদলে ফেলতে পারবেন। (ওদিকে উইন্ডোজে মাইক্রোসফট এজ আনইন্সটল করতে গেলে সিস্টেম ব্রেক করে…)
উদাহরণ দিই একটা, XFCE-র ডিফল্ট উইন্ডো ম্যানেজার হলো Xfwm4। এটা বেশ সিম্পল, উইন্ডো ওপেন, ক্লোজ, মিনিমাইজে কোন ইফেক্ট বা এনিমেশন নেই এবং কাস্টমাইজেশন সীমিত। কিন্তু আপনি সিম্পলি সেটিংস থেকে যদি উইন্ডো ম্যানেজার Compiz সেট করে নেন, আর তারপর একবার Compiz কাস্টমাইজেশনের জগৎ আবিষ্কার করেন- আপনি জাস্ট যতরকম অপশন আছে এখানে, তার মধ্যে হারিয়ে যাবেন।

অনেক দিক থেকে Compiz এক্সপ্রেরিয়েন্সকে আরো ফাংশনাল করে তুলতে পারে। যেমন- Compiz এর ওয়ার্কস্পেস ম্যানেজমেন্ট Xfwm4 থেকে অনেক এডভান্সড। এর বাইরে ডেস্কটপ কিউব, উবলি উইন্ডোসহ পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত সব ইফেক্টস আর এনিমেশন এখানে আছে। এবং এমন সব অপশনসও আছে, যেখানে আপনি মাথামুন্ডু খুঁজে পাবেন না why these things even exist, কিন্তু those are just fun to play with। তবে ওপরের ছবির ওয়ার্নিং যেমন দেখতে পারছেন, জিনিসপত্র সহজেই messed up করে ফেলার আশঙ্কা আছে।

এর সাথে Conky (উইজেট ধরণের), ভিন্ন কোন প্যানেল প্রভৃতি যোগ করে XFCE ডেস্কটপকে বিভিন্নরকম মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
লিনাক্স মিন্ট XFCE: কাদের জন্য?
লিনাক্স মিন্ট এমনিতে নতুনদের জন্য অবশ্যই ভালো একটি অপশন। তবে সাধারণভাবে লিনাক্স মিন্টের মধ্যে সিনামন ভার্সনটাই আমি সাজেস্ট করব। তবে যদি আপনার আরো লাইটওয়েট কিছু প্রয়োজন হয়, অথবা সিমপ্লি XFCE-র ব্যাপারগুলো আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে বা প্রিফারেন্সের সাথে যায় মনে হয়, সেক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করতেই পারেন!
লিনাক্স মিন্ট – অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
আপনার মতামত ও পরামর্শ কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। পাশাপাশি আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপ নিয়ন আলাপ গ্রুপে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ রইলো।






