লিনাক্স ডিস্ট্রো রিভিউ (পর্ব-৩): জরিন ওএস

আসসালামু আলাইকুম। GR+ BD এর ধারাবাহিক লিনাক্স ডিস্ট্রো রিভিউয়ের আজকের তৃতীয় পর্বে আমাদের আলোচনায় থাকবে জরিন ওএস।

১২ বছর আর ১৪ বছর বয়সী দুই ভাইয়ের উবুন্টু ৭.১০ এর মাধ্যমে প্রথম লিনাক্স চালানো- সেই মুহুর্তটাই ছিলো জরিন ওএসের স্বপ্নযাত্রার শুরুর গল্প। দুই ভাই দ্রুতই বুঝতে পারে- লিনাক্স অনেক পাওয়ারফুল হলেও সাধারণ ইউজারদের জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিলো উইন্ডোজ আর ম্যাক ওএস থেকে এটার ইউজার ইন্টারফেস কতটা ভিন্ন ধরণের।

তখন ২০০৮ সাল। স্কুলগুলোতে কম্পিউটার সায়েন্স বা প্রোগ্রামিং শেখানো হত না। বইপুস্তক, ইউটিউব আর গুগল ছিলো- তবে এখনকার মত এত সমৃদ্ধ রিসোর্স পাওয়া সহজ ছিলো না। তবে দুই ভাইয়ের ডেডিকেশন ছিলো শক্ত। তার ফলাফল? মাত্র ৯ মাস পর, ১ জুলাই ২০০৯ রিলিজ হয় জরিন ওএস 1.0।

Zorin OS 1.0

জরিন ওএসের শুরুর গল্পটা বাস্তবের থেকে যেন গল্পের মতই শোনায়। লিনাক্সের স্বাধীনতার জন্য শখের বশে কাস্টমাইজড অপারেটিং সিস্টেম তো অনেকই তৈরি হয়েছে- কিন্তু দুই কিশোরের হাত ধরে শুরু করা সেই অপারেটিং সিস্টেম এখন ডেস্কটপ লিনাক্সের জগতে খুব পরিচিত একটা নাম। নামটা এসেছে সেই দুই ভাইয়ের নাম থেকেই- Artyom Zorin আর Kyrill Zorin। (Artyom Zorin-এর ইন্টারভিউ)

একটা লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম, যেখানে উইন্ডোজ বা ম্যাক ইউজাররা শুরু থেকেই কমফোর্টেবল ফিল করবে- জরিন ওএসের লক্ষ্যটা ঠিক ছিলো শুরু থেকেই। জরিন ওএসের প্রথম দিকের ভার্সনগুলোতে উইন্ডোজ সেভেনের সাথে মিল খুঁজে নেয়া একদমই কঠিন হবে না। তবে সময়ের সাথে জরিন ওএস তার নিজের ছন্দ খুঁজে নিয়েছে- উইন্ডোজের অনুপ্রেরণা থাকলেও উইন্ডোজের কপি হয়ে ওঠেনি।

Zorin OS 10

জরিন ওএস

জরিন ওএস প্রথম দেখা থেকে দৃষ্টিনন্দন সুন্দর একটি অপারেটিং সিস্টেম। যদিও ফিডোরা আর উবুন্টুর মত এখানেও গ্নোম ডেস্কটপ ব্যবহার হয়েছে- জরিন ওএসের এক্সপ্রেরিয়েন্স অনেকটাই তার নিজের মত।

সামগ্রিকভাবে ফ্লাট ডিজাইন, তবে তার সাথে একটিভ কালারে ঈষৎ গ্রাডিয়েন্সের ব্যবহার একে একটা অন্যরকম সৌন্দর্য্য দিয়েছে। প্রায় যে কারো-ই ভালো লাগবে।

জরিন ওএসের বড় একটা আকর্ষণ হলো Zorin Appearence। এখানে ফ্রি ভার্সনে ৪টি ও প্রো ভার্সনে মোট ১০ টি লেআউট পাওয়া যাবে, যা এক ক্লিকে পরিবর্তন করা যাবে। এছাড়া থিম, বিভিন্ন ডেস্কটপ ইফেক্ট প্রভৃতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

Windows, Windows-List, Touch, Gnome চারটি লেআউট রয়েছে ফ্রি ভার্সনে
ডার্ক মোড ও মাল্টিটাস্কিং ভিউ

তার সাথে Jelly Mode, Spatial Window Switcher, Desktop Cube এরকম চমৎকার ইফেক্টগুলো এখান থেকে এনাবল করা যাবে, যা ডেস্কটপ ব্যবহারে একটা ফান ফ্যাক্টর যোগ করে।

ডেস্কটপ কিউব ইফেক্ট

গ্নোম ডেস্কটপসহ অন্যান্য অপারেটিং সিস্টেমে এক্সটেনশনের মাধ্যমে এরকম কাস্টমাইজেশন করা গেলেও জরিন ওএস কাস্টমাইজেশনগুলো অনেক সহজ ও আউট অফ দা বক্স অনেক ইউজার ফ্রেন্ডলি করে দিয়েছে।

রিলিজ শিডিউল

জরিন ওএসের একটা মুশকিলের জায়গা হলো এর রিলিজ শিডিউল। জরিন ওএস বর্তমানে ২ বছর পরপর নতুন ভার্সন রিলিজ করে। এবং তা উবুন্টুর সর্বশেষ LTS ভার্সনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। যেমন Zorin OS 17 তৈরি হয়েছে Ubuntu 22.04 LTS এর ওপর ভিত্তি করে- যা ২০২২ সালের এপ্রিলে রিলিজ হয়েছিলো।

যদিও তারা এর মধ্যে পয়েন্ট রিলিজ আনে, যেমন Zorin OS 17.3 হলো লেটেস্ট, যেটা রিলিজ হয়েছে এবছরের ২৬ মে-তে। তবে পয়েন্ট রিলিজগুলোতে নতুন ফিচার, ইম্প্রুভমেন্ট, কার্নেল ভার্সন আপডেট প্রভৃতি থাকলেও কোর কম্পোনেন্ট যেমন ডেস্কটপ এনভায়রনমেন্ট, অপারেটিং সিস্টেম বেজ প্রভৃতি পরির্তন হয় না।

Zorin OS 17, Gnome 43 ডেস্কটপ ব্যবহার করছে, যেখানে লেটেস্ট হলো Gnome 48। যেকারণে লেটেস্ট কিছু ফিচার ও ইম্প্রুভমেন্ট এখানে পাওয়া যাবে না। যেমন- সেটিংসে বিভিন্ন রিফাইনমেন্ট, ফাইল ম্যানেজার ইম্প্রুভমেন্ট প্রভৃতি। এছাড়া এটা এখনো X11 ডিসপ্লে সার্ভারে আছে, যেটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে পুরনো প্রযুক্তি।

তবে জরিন ওএস-এর কাস্টমাইজেশন, অপটিমাইজেশন ও নিজস্ব রিপোজিটরী প্রভৃতি মিলিয়ে তার প্রভাব তত বেশি না। উদাহরণস্বরূপ, গ্নোমের টাচপ্যাড জেসচারগুলো বাই ডিফল্ট শুধু ওয়েল্যান্ড সার্ভারে কাজ করলেও জরিন ওএস X11-এ সেটা যুক্ত করে দিয়েছে। আবার Ubuntu 22.04 এর রিপোজিটরীর তুলনায় বিভিন্ন সফটওয়্যারের আপডেেটেড ভার্সন জরিন ওএস নিজস্ব রিপোজিটরীর মাধ্যমে সরবারহ করে। এছাড়া Software 45, Files 42 এরকম কিছু সিস্টেম ইউটিলিটি ভার্সন তারা মিক্স-এন্ড-ম্যাচ করেছে স্ট্যাবল ও বেটার এক্সপ্রেরিয়েন্স দিতে।

পারফর্মেন্স

গ্নোম ডেস্কটপ সাধারণত বিশেষভাবে লাইটওয়েট হিসেবে পরিচিত না। তবে জরিন ওএস কার্নেল ও ডেস্কটপসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে কম কনফিগারেশনের পিসিতে বেটার পারফর্মেন্স এনে দেয়ার চেষ্টা করেছে।

জরিন ওএস বলছে তারা মিনিমাম র‌্যাম রিকুয়ারমেন্ট 1.5 GB তে নামিয়ে এনেছে। তবে 2 GB পর্যন্ত র‌্যাম থাকলে আরো লাইটওয়েট যেমন XFCE, Mate, LXQt ডেস্কটপগুলো বেটার অপশন হতে পারে, তবে সেগুলোর এক্সপ্রেরিয়েন্স কিছুটা ওল্ড-ফ্যাশনড। ওভারঅল, পারফর্মেন্স ও মডার্ন এক্সপ্রেরিয়েন্সের ভারসাম্যের জন্য জরিন ওএস একটা ভালো জায়গায় আছে।

সম্প্রতি বাসার ডেস্কটপে জরিন ওএস ইন্সটল করেছিলাম। কনফিগারেশন Core i3-3225 ও 4 GB DDR3 র‌্যাম। Windows 10 এখানে খুবই স্লো হলেও জরিন ওএস যথেষ্ট ভালো পারফর্ম করে। অবশ্যই এধরণের কম্পিউটারে মাল্টিটাস্কিং বা ব্রাউজারে বেশি ট্যাব ওপেন করলে তা স্লো করবে।

জরিন ওএসের একটা লাইট এডিশন আছে, যেটা XFCE ডেস্কটপ ব্যবহার করে। তবে যেহেতু তারা গ্নোম ভার্সনটির রিসোর্স ইউসেজ অনেকটা অপ্টিমাইজড করেছে- পরবর্তী ভার্সন Zorin OS 18 পর্যন্ত তারা Lite ভার্সন কন্টিনিউ করলেও Zorin OS 19 থেকে এই ভার্সনটি তারা ডিসকন্টিনিউ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

Zorin OS Lite

প্যাকেজিং ও উইন্ডোজ অ্যাপ সাপোর্ট

উবুন্টু নিয়ে লেখার সময় বড় একটা অংশ আমি বরাদ্দ করেছিলাম Snap নিয়ে বলার জন্য। Zorin OS আউট অফ দা বক্স ট্রেডিশনাল apt প্যাকেজিংয়ের পাশাপাশি Flatpak ও Snap উভয়টি সমর্থন করে। তবে উবুন্টু যেখানে Snap অ্যাপকে অনেক বেশি ফোকাস করে, জরিন ওএসের ক্ষেত্রে Software থেকে খুব ইজিলি ইন্সটলেশনের সোর্স নির্বাচন করা যায়।

উবুন্টুভিত্তিক হওয়াতে উবুন্টু সমর্থিত সব অ্যাপই জরিন ওএসে সমর্থন করবে। Flatpak, Snap ও জরিন ওএসের রিপোজিটরী মিলিয়ে Software থেকে লিনাক্স অ্যাপের একটা হিউজ কালেকশন পেয়ে যাবেন।

উইন্ডোজ অ্যাপ সাপোর্ট

লিনাক্সে উইন্ডোজ অ্যাপ (.exe বা .msi ফরমেট) চালানোর জন্য WINE ও এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি কিছু কম্প্যাটিবিলিটি টুল আছে। উইন্ডোজ সফটওয়্যারগুলোর বেশ ভালো একটা অংশ এর মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়- যদিও সব না, এবং অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি স্টেপস দরকার হয়। যাইহোক, জরিন ওএসের আগের ভার্নসগুলোতে WINE ও PlayOnLinux প্রিইন্সটল্ড থাকতো, যেকারণে আউট অফ দা বক্স উইন্ডোজ সফটওয়্যার চালানো যেতো।

তবে এখন জরিন ওএস এখন আর এগুলো প্রিইন্সটল্ড রাখে না। তার বদলে পরিবর্তে Windows Apps Support নামে একটি টুল তৈরি করেছে যা WINE ও Bottles সেটআপ বান্ডল করা আছে- যা কম্প্যাটিবিলিটি টুলগুলো ইন্সটল করা একদম সহজ রেখেছে। আবার উইন্ডোজ অ্যাপ ইন্সটল করার সময় যদি লিনাক্স ভার্সন থাকে, বা কোন বিকল্প থাকে, বা উইন্ডোজ ভার্সন লিনাক্সে ইন্সটল করার বেটার কোন উপায় থাকে এরকম ক্ষেত্রে শনাক্ত করে ব্যবহারকারীকে রেকমেন্ডেশন দেয়ার জন্য তারা ১০০-র বেশি অ্যাপের ডাটাবেজ তৈরি করেছে।

জরিন কানেক্ট

জরিন ওএসের আরেকটা চমৎকার অ্যাপ হলো জরিন কানেক্ট। এটা কেডিই কানেক্ট-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটা চমৎকার সফটওয়্যার যার মাধ্যমে আপনার অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসকে লিনাক্সের সাথে কানেক্ট করতে পারবেন এবং এটা খুবই পাওয়ারফুল- ফাইল শেয়ারিং, রিমোট ইনপুট (কীবোর্ড/মাউসের মত), মাল্টিমিডিয়া কন্ট্রোলসহ বিভিন্ন ফিচার আছে।

প্রাইসিং

লিনাক্স বা ওপেন সোর্স মানেই যে ফ্রি হতে হবে, ব্যাপারটা কিন্তু এরকম না। ওপেন সোর্সের ব্যাপারটা অনেক বেশি ব্যবহারকারীর স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত, তবে একটা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার পেইড হতেই পারে।

জরিন ওএসের ক্ষেত্রে- তাদের একটি প্রো ভার্সন আছে- যেখানে বাড়তি কিছু ডেস্কটপ লেআউট, বিভিন্ন প্রিইন্সটল্ড অ্যাপস ও ইন্সটলেশন সংক্রান্ত টেকনিকাল সাপোর্ট ইনক্লুডেড আছে। অ্যাপসগুলো মূলত ফ্রি অ্যাপসই, অর্থাৎ আপনি সবগুলোই সফটওয়্যার থেকে আলাদাভাবে ইন্সটল করে নিতে পারবেন। এক্সট্রা ডেস্কটপ লেআউটগুলো মূল আকর্ষণ। তবে সত্যি বলতে $47.99 দিয়ে প্রো ভার্সনটি কেনার মূল উদ্দেশ্য হবে জরিন ওএসকে সাপোর্ট করা।

অন্যদিকে কোর, লাইট ও এডুকেশন ভার্সনগুলো ফ্রি। আমরা এই লেখা মূলত কোর ভার্সনে ফোকাস করেছি, লাইট ভার্সনের কথাও এসেছে। এডুকেশন ভার্সনে কোর ভার্সনের সাথে কিছু এডুকেশনাল অ্যাপস প্রিইন্সটল্ড আছে।

পার্সোনালি আমার কাছে পেইড ভার্সন রাখাটা বেশ ভালো একটা মডেল মনে হয়। বিশেষ করে জরিন ওএসের ক্ষেত্রে ফ্রি ভার্সনগুলোতে কয়েকটি লেআউট কম থাকা ছাড়া আলাদা কোন লিমিটেশন নেই।

তবে একটা সমস্যার দিক হলো আপনি যদি Zorin OS 17 Pro কিনেন, তবে 17 সিরিজের সব আপডেট আপনি পাবেন। কিন্তু Zorin OS 18 আসলে Pro ভার্সন নতুনভাবে কিনতে হবে।

জরিন ওএস: কাদের জন্য?

রিভিউটা এমন একটা সময়ে লিখছি, যখন Zorin OS 18 আসার সময় ঘনিয়ে আসছে, তবে এখনো লেটেস্ট ভার্সন Zorin OS 17, যা ৩ বছর আগের বেজে আছে। পুরনো বেজে থাকার বিষয়টার প্রভাব ক্ষেত্রবিশেষে থাকতে পারে, যেমন- সাম্প্রতিক বিভিন্ন পারফর্মেন্স ইমপ্রুভমেন্ট, HiDPI ডিসপ্লে সাপোর্ট প্রভৃতি ইম্প্রুভমেন্ট এই বিষয়গুলো। কিছু হার্ডওয়্যারে ও কিছু ইউজকেসে জন্য এর প্রভাব থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ ইউজারের জন্য না।

তো এরকম একটা সময়েও সামগ্রিকভাবে আমি জরিন ওএস বেশ স্বচ্ছন্দ্যেই লিনাক্সে নতুন আসতে আগ্রহীদের সাজেস্ট করতে পারি। পরিচিত ও ওয়েল-টিউনড একটা এক্সপ্রেরিয়েন্স দিবে জরিন ওএস। রেডি টু ইউজ এবং ইউজার ফ্রেন্ডলি ডেস্কটপ চাইলে জরিন ওএস একটা ভালো অপশন।

জয়েন করুন: নিয়ন আলাপ টেলিগ্রাম গ্রুপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *