বাটন ফোনের অতীত, বর্তমান এবং Symphony S100

আসসালামু আলাইকুম। স্মার্টফোন এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এর মধ্যেও স্মার্টফোনের পরিবর্তে অথবা পাশাপাশি ফিচার ফোন ব্যবহার করেন এমন একটা বড় অংশ আছে। তবে বাটন ফোন নিজে হারিয়ে না গেলেও বাটন ফোনের বৈচিত্র অনেকাংশে হারিয়েছে। একঘেয়ে ইন্টারফেস, একই ধরণের ফিচার সেট, নামেমাত্র ক্যামেরা, ক্ষেত্রবিশেষে বড় ব্যাটারী ও টর্চ বা স্পিকার- মোটামুটি সব ফিচার ফোনকেই সামারি করতে পারবে এই ক’টি বৈশিষ্ট্য।

মেটাল বিল্ডের সাথে বৈচিত্রময় ডিজাইন, ক্যামেরা যাতে একচুয়ালি ছবি তোলা যেতো, QWERTY কীবোর্ড ফোন, জাভা গেমস, আর সিমপ্লি ইউজলেস ফান থিংস- ব্যাপারগুলো এখনকার ফিচার ফোন থেকে প্রায় পুরোপুরিই হারিয়ে গেছে। তবে এই সময়ে এসে নতুন একটা বিষয় আমরা দেখছি, ফিচার ফোন ও স্মার্টফোনকে কিছুটা সমন্বয় করার চেষ্টা। যেমন 4G ও WiFi সহ কিছু ফোন সম্প্রতি বাজারে এসেছে, কিছু ফোন অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে এসেছে। মাঝখানে KaiOS কিছুটা সম্ভাবনা জাগিয়েছিলো, যদিও কোন কারণে তা অনেকটা হারিয়েও গেছে দ্রুতই।

তো এরকম একটা পরিস্থিতিতে সিম্ফনি নতুন একটি ফিচার ফোন এনেছে, Symphony S100। এটাও একদিক থেকে ফিচার ফোনের মধ্যে কিছুটা স্মার্টফোনের ছোঁয়া আনার চেষ্টা, তবে তা ফাংশনালিটির দিক থেকে না, অ্যাস্থেটিকের দিক থেকে। Symphony S100-এ আছে টাচ স্ক্রিন ও টাচ কীপ্যাড, স্মার্টফোনের মত ডিজাইন, সাইড বাটন, টাইপ সি পোর্ট প্রভৃতি। অবশ্য ফিচারের দিক থেকে এটা নেহায়েত সাধারণ বাটন ফোন- 4G বা WiFi নেই, আলাদা অ্যাপ ইন্সটল ধরণের কিছু নেই।

তো শুরু করি ডিজাইন থেকে। পার্সোনালি, আমি প্রত্যেকটা ব্র্যান্ডের একটা আইডেন্টিটি থাকা উচিৎ মনে করি। যেকারণে বাজেট ডিভাইসগুলোতে আইফোনের মত শেইপ ও ক্যামেরা মডিউল কপি করার বিষয়টি আমার পছন্দ না- সেটা ফিচার ফোন হোক, কিংবা অ্যান্ড্রয়েড। এবং কোম্পানিগুলোর অ্যাপলকে কপি করার এই প্রবণতা কেন, এই প্রশ্নের উত্তরটাও আমার জানা নেই।

তবে তার বাইরে, ফোনটা সুন্দর। গ্লাস-লাইক ডিজাইন, সাইড বাটন মিলিয়ে অনেক স্মার্টফোনের সাথে এটা মিলে যাবে। বিশেষ করে Cotton White, Caramel Gold সুন্দর নামের কালারগুলো দেখতেও সুন্দর।

৫টি কালার ভ্যারিয়েন্ট আছে মোট। তবে সামনের দিকে সবগুলোই ব্লাক। এই অংশে রয়েছে ফোনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ- একটি 2.8″ QVGA (240×320) টাচ ডিসপ্লে এবং টাচ কীপ্যাড। Itel Magic 3 ও Magic 4 ফোনগুলোতে টাচ কীপ্যাড ছিলো। টাচ ডিসপ্লেসহ ফিচার ফোন অনেকদিন পরে দেখলাম।

ফিচার ফোনে টাচ ডিসপ্লে কিন্তু একদম নতুন না। অনেকের হয়ত মনে আছে স্মার্টফোন আসার আগে এক ধরণের টাচ ডিসপ্লের বিভিন্ন ফোন ছিলো- এখনকার ক্যাপাসিটিভ টাচের মত আঙুল দিয়ে কাজ করত না, স্টাইলাস বা নখ ব্যবহার করতে হত। ফিচার ফোনের হারিয়ে যাওয়া ফিচারগুলোর আরো একটা।

ফোনটা আমি ব্যবহার করিনি, তাই ইউজার এক্সপ্রেরিয়েন্স নিয়ে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এর ইন্টারফেসের কিছু স্ক্রিনশট আমার কাছে আছে, আমার কাছে বেশ সুন্দর ও রিফ্রেশিং লেগেছে এর ইন্টারফেস।

ফোনটিতে মিডিয়াটেকের MT6261A প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে। র‌্যাম থাকছে 4 MB (32 Mb), এবং রম 8 MB (64 Mb)। অর্থাৎ কোন মাল্টিমিডিয়া ফাইল রাখতে হলে আলাদা মেমোরি কার্ড প্রয়োজন হবে। ফোনটির সাইড মাউন্টেড কার্ড স্লটে দুটি সিমের পাশাপাশি একটি MicroSD কার্ড স্লট আছে, যা 32 GB পর্যন্ত স্টোরেজ এক্সপেনশন সাপোর্ট করে।

বটম মাউন্টেড স্পিকারের পাশাপাশি কল রিসিভের জন্য আলাদা রিসিভার থাকছে। তো কল কোয়ালিটি খারাপ হওয়ার কথা না। যদিও এক্সপ্রেরিয়েন্স না করে বলা সম্ভব না। FM Radio রয়েছে এখানে, এবং তা ওয়ারলেস। ইয়ারফোন ব্যবহার করতে চাইলে 3.5 mm ইয়ারফোন পোর্ট আছে।

ব্যাটারীর কথা বললে 1850 mAh ব্যাটারী থাকছে এখানে। বাটন ফোন বিবেচনায় বেশ বড় ব্যাটারী। চার্জিংয়ের জন্য থাকছে টাইপ সি পোর্ট। তবে চার্জিং 5V 0.5 A, মানে 2.5 W। ফুল চার্জ হতে পুরো সাড়ে চার ঘন্টা দরকার হবে, যা একটা লেটডাউন। অন্ততপক্ষে 5 W চার্জিং তো থাকা উচিৎ ছিলোই। টাইপ সি পোর্টের ব্যাপারটাকে অবশ্য প্রশংসা করাই যায়, কারণে সব ধরণের ডিভাইসেরই এটা এডপ্ট করে নেয়ার সময় এসেছে।

Symphony S100 এর দাম ধরা হয়েছে ২৩০০ টাকা। টাচস্ক্রিন, ডিজাইন ও অ্যাস্থেটিকের জন্য অনেকের কাছেই এই দামে আকর্ষণীয় হতে পারে ডিভাইসটি। আমরা যদি চিন্তা করি, ফিচার ফোনকে সব মানুষ এক জায়গা থেকে দেখে না। কারো কাছে এটা শুধু কল করা ও রিসিভ করার ডিভাইস। আবার কেউ কেউ বর্তমানে 4G, WiFi বা Android অপারেটিং সিস্টেম প্রত্যাশা করছেন। কাজেই সবার কাছে বাটন ফোন কিন্তু একই জায়গাতে নেই।

স্মার্টফোনের কথা যদি চিন্তা করি, ওখানে বলতে গেলে সবই করা যায়। সব করা গেলে আসলে মজাটা একরকম থাকে না। ফিচার ফোনের বেলায় ‘কী কী করা যায়’ এই ব্যাপারটা ডিসকভার করার জায়গায় একটা মজা আছে। যেমন আমার জীবনের প্রথম ডিভাইস Symphony D101-এ 0.3 MP সেলফি ক্যামেরা ছিলো, এবং এই বাটন ফোনেই আমার স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সাথে প্রচুর সেলফি ছবি তোলা আছে। সাইমুম সিরিজের একটা বড় অংশ কলেজে বসে ফিচার ফোনে অপেরা মিনি থেকে পড়া। আর ছোটবেলায় খেলা বাটন ফোনের সব গেমস, আর আরেকটু পরবর্তীকালের জাভা গেমস, সো তো আরেক অধ্যায়…

Symphony S100 এর কথায় আসি এখন। ফোনটিতে অপেরা মিনি আছে, যেটা আমার কাছে এই ফোনের একটা প্রশংসনীয় দিক হবে। কিন্তু এখানে নেটওয়ার্ক হলো GPRS। যেটা খুবই স্লো। EDGE নেটওয়ার্ক থাকলে ব্রাউজিং অনেকটা সহনীয় হত। আরেকটা দুঃখজনক সত্য হলো এখনকার সময়ে ইন্টারনেটের দুনিয়াও আর অপেরা মিনি আর ফিচার ফোনের জন্য খুব একটা উপযুক্ত না। যেমন এখন আর অপেরা মিনিতে ফেসবুক সমর্থন করে না, এবং সত্যি বলতে আমি নিজেও যদি কোন কাজ করি, বাটন ফোনের কম্প্যাটিবিলিটি বিবেচনা করা হয় না। যাইহোক, ইন্টারনেটের কিছু অংশের একসেস দিবে অপেরা মিনি থাকার ব্যাপারটা।

তবে ক্যামেরাতে আমরা দেখছি 0.08 MP এর নামেমাত্র একটি ক্যামেরা। অনেকে হয়ত সেকেন্ডারি ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করবে, যাদের ক্যামেরাটা দরকার নেই। কিন্তু অনেকের হয়ত স্মার্টফোনের বাজেটটা নেই, কিংবা স্কুল-কলেজে স্মার্টফোনের অনুমতি নেই বলে বাটন ফোন চালানো- তাদের জন্য একটু ছবি তোলার মত ক্যামেরাটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০০০ টাকার ওপরে একটা ফোনে 0.3 MP, এমনকি 1 MP ক্যামেরা আশা করা মনে হয় দোষের কিছু না- অতীতে সিম্ফনি 2 MP ক্যামেরাও দিয়েছে বাটন ফোনে।

এখনকার ফোনগুলোর আরেকটি দিক হলো এগুলোতে গেমস থাকলে প্রায়ই আলাদাভাবে ১০ টাকা দিয়ে কেনা লাগে এবং সেগুলো খুবই লো কোয়ালিটির। এটা শুধু বয়স আর সময়ের জন্য না, নোকিয়ার আইকনিক গেমগুলো বাদ দিলেও অতীতের ফোনগুলোতে F1 Race, Panda Climb, Plumber, স্পেস শ্যুটার টাইপের যে গেমগুলো থাকতো, তার সাথে এখনকার বাটন ফোনের গেমগুলো তুলনাতে একদমই আসবে না। তো ওগুলো থাকার থেকে না থাকা ভালো এবং Symphony S100 এ বিল্টইন কোন গেম নেই।

তবে তার সাথে জাভা সাপোর্টও নেই এখানে। জানি না কেন, ২০০০ টাকার ওপরের বাজেটেও এখন জাভা দিচ্ছে না বা দিতে পারছে না কোম্পানিগুলো, যেখানে (বেশ) কয়েক বছর আগে ১২০০-১৩০০ টাকার ওপরের প্রায় সব ফোনগুলোতে কিছু মাত্রায় হলেও জাভা সাপোর্ট থাকতো।

যাইহোক, ইন এনি কেস- টাচ স্ক্রিন, অপেরা মিনি, আলাদা রিসিভার, স্মার্টফোন অ্যাস্থেটিকস, ইউআই, টাইপ সি পোর্ট- Symphony S100 যে বাজারের আর সব ফিচার ফোন থেকে একেবারেই আলাদা কিছু দিচ্ছে না, এমন না। আকর্ষণ করার মত দিক এখানে আছে। ২৩০০ টাকায় ফোনটা কেনার মত যথেষ্ট কারণ আমি দেখি অনেকের জন্যই।

আমার একচুয়ালি অনেকাংশে এই ফোনটা ভালো লেগেছে। রিসেন্ট বাটন ফোনগুলোর একঘেয়েমির ভিড়ে কিছুটা হলেও নতুনত্ব পেয়েছি। তবে বাটন ফোন থেকে 4G বা হটস্পট প্রত্যাশীদের যেমন না, তেমনি আমার মত অতীত স্মৃতির রোমন্থন করতে চাওয়া মানুষদের জন্যও এই ফোনটা পুরোপুরি হয়ে উঠতে পারেনি।

এই পর্যায়ে একটা চিন্তার খোরাক রেখে শেষ করতে চাই। একটা সময় ৩০০০ থেকে ১০০০০ টাকার ফিচার ফোন বেশ স্বাভাবিক ছিলো। অন্যদিকে এখন ২০০০ টাকা অনেকটা বেশি বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে ধরা যাক কেউ চেষ্টা করলো বাজেট একটু বাড়লেও পূর্ণাঙ্গ একটা নন-অ্যান্ড্রয়েড ফিচার ফোন নিয়ে আসতে- ক্যাপাবল হার্ডওয়্যারের সাথে পূর্ণ জাভা সমর্থন, ফিচার ফোনের স্ট্যান্ডার্ডে ভালো ক্যামেরা দিয়ে। তাতে দাম মনে করা যাক ৩০০০ টাকা পার করে ফেললো। এমন অবস্থায় ডিভাইসটি কেনা কি আপনি যৌক্তিক মনে করবেন এবং মার্কেটে তা কি অদৌ জায়গা পাবে বলে মনে হয় আপনার?

অথবা আমরা যদি বাজেটের সীমাবদ্ধতা সাথে রেখে চিন্তা করি, ২০০০ টাকার ওপরের বাজেটে অনেককিছু দেয়া সম্ভব। তবে হয়ত সব একসাথে রাখা সম্ভব না। এটা মাথায় রেখে কীধরণের ফিচার ফোন আপনি নিজে কিনলে প্রিফার করতেন? এবং ম্যাস মার্কেটের জন্য কোন ধরণের ডিভাইস সবচেয়ে সফল হবে বলে মনে করেন? কারণ তাত্ত্বিক আলাপটা এক জায়গায়, মার্কেটের চিত্র কিন্তু আরেকরকম হতে পারে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *